অনার কিলিং: একটি মেয়ের জীবন কি এতোই তুচ্ছ?

|এডিটরিয়াল ডেস্ক|

আজ সকালের বিবিসির খবর:-

লাহোরের একটি আদালতের বাইরে দিনে দুপুরে মধ্যে পাথর দিয়ে একজন পাকিস্তানী মহিলাকে তার স্বামীর সামনে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকলেও আক্রমণ বন্ধ করার জন্য কিছু করেনি।

মহিলাটির নাম ফারজানা পারভিন (২৫) যিনি তিন মাসের গর্ভবতী ছিলেন, ভালোবাসার একজন মানুষকে বিয়ে অপরাধে মঙ্গলবার তার পরিবার তাকে হত্যা করে।

“আমরা সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করেছি; কিন্তু কেউ শোনেনি,” তার স্বামী, মুহাম্মদ ইকবাল, জানিয়েছেন।

পাকিস্তানে তথাকথিত “অনার কিলিং” এর নামে প্রতি বছর শত শত নারীকে হত্যা করা হয়।

পরিবার বা গোত্রের সম্মানহানির দায়ে আপনজনকে হত্যাকে অনার কিলিং বলা হয়ে থাকে। এরকম অনার-কিলিং বা সম্মানের জন্য হত্যার মত বিভৎস ব্যাপার পৃথিবীতে বহুকাল থেকেই চলে আসছে। ভাবতে অবাক লাগে এই আধুনিক যুগেও অনেক মেয়েকেই এই নির্মম মৃত্যুর শিকার হতে হয়। এখনও সব মহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় অনার কিলিং প্রচলিত। এ হত্যাগুলোর কাহিনী এতই মর্মান্তিক ও বিভৎস যে শুনলে রীতিমত শিউরে উঠতে হয়। অন্ধবিশ্বাস, কুশিক্ষা মানুষকে কোন পর্যায়ে নামাতে পারে এসব কাহিনী না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। অনার-কিলিং এর প্রতিটি কাহিনী আপনজনের হাতে আপনজনের মৃত্যুর কাহিনী, ভাইয়ের হাতে বোনকে হত্যার কাহিনী, বাবার মেয়েকে জ্যান্ত কবর দেবার কাহিনী। এ লেখায় উঠিয়ে আনার চেষ্টা করেছি তেমনই কিছু কাহিনী, কিছু পরিসংখ্যান, এসবই কঠোর বাস্তবতা যা এড়িয়ে যাবার অধিকার আমাদের নেই।

৪ই ফেব্রুয়ারী ২০১০, guardian.co.uk সাইটে ছাপানো খবর। তুরস্কে পুলিশ একটি ১৬ বছর বয়সী মেয়ের লাশ উদ্ধার করে। মেয়েটির অপরাধ ছিল ছেলেদের সাথে কথা বলা, সে জন্য তাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেয় তার আত্মীয়রা। লাশটির দুই হাত বাধা ছিল। ময়নাতদন্তে মেয়েটির শরীরের ভিতরে প্রচুর পরিমাণ মাটি পাওয়া যায় যা থেকে বোঝা যায় তাকে জ্যান্ত কবর দেয়া হয়েছিল।

এ খবরে চমকে উঠেছেন? তুরস্কতে বছরে প্রায় ২০০টি এধরনের হত্যা সংগঠিত হয়। বলাই বাহুল্য অনার কিলিং এর প্রধান শিকার হলো নারীরা। যেসব দেশে এ প্রথা অধিক প্রচলিত তাদের মধ্যে আছে পাকিস্তান, জর্ডান,লেবানান,মরোক্ক, সিরিয়ান রিপাবলিক ছাড়া অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। তবে ইংল্যান্ড,ফ্রান্স,জার্মানীর মত দেশেও অনার কিলিং এর খবর পাওয়া যায়।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে ৩জন মেয়েকে জ্যান্ত কবর দেয়া হয়, তাদের অপরাধ তারা নিজেরা তাদের স্বামী নির্বাচন করতে চেয়েছিল। এ হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলুচিস্তানের রাজনীতিবিদরা একে “গোত্রের রীতি” বলে হত্যাকারীদের পক্ষ সমর্থন করে। নুর আলমেকি (Noor Almaleki) আরেকজন এরকম বিভৎসতার শিকার আরেকটা নারী, অ্যারিজোনায় তার মুসলিম বাবা গায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে, কারন মেয়েটি নাকি খুব বেশি westernised হয়ে যাচ্ছিল। গাড়ি চাপা পড়ার পর অসহ্য যন্ত্রনায় ৭দিন বেচে থেকে সে মারা যায়।

২০০৬ সালে ইরাকের বসরা শহরে ১৩৩জন নারীকে হত্যা করা হয়, ৭৯জনের অপরাধ ছিল ইসলামি অনুশাসন লঙ্ঘন, ৪৭টি অনার-কিলিং। জর্দানে অনেক পরিবারের ১৮বছরের কম বয়স্ক ছেলেরা অনার-কিলিং এর সাথে জড়িত। জর্দানের আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ত অপরাধীদের juvenile detention center এ পাঠানো হয় ও পরে তারা clean criminal record নিয়ে বের হয়ে আসে, আইনের এ লুপহোলের সুযোগ নিচ্ছে সেখানকার ছেলেরা। ২০০৩ সালে জেমস ইমারি (James Emery- প্রফেসর,মেট্রোপলিটন স্টেট কলেজ, ডেনভার) এক প্রবন্ধে বলেন যে গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক,জর্দান,ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি কমিউনিটিতে নারীদের হত্যা করা হয় খোলা মাঠে, ঘরে, কোন কোন সময় প্রকাশ্যে আর প্রায় সব হত্যাকান্ডের জন্যই অনার-কিলিং প্রথা দায়ী। ইসরাইলে অবস্থা কিছুটা ভাল, সেখানে এধরনের অপরাধীর জন্য কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

২০০৯ এর ফেব্রুয়ারীতে ভারতে অনার-কিলিং এর নামে ৮জনের শিরোচ্ছেদ করা হয়। পুলিশ লাশগুলো গঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার করে। একই মাসে জার্মানীতে ঘটে আরেক বিভৎস কাহিনী। আহমেদ নামক এক জার্মান-আফগান তার ১৬ বছর বয়সী বোনকে ২৩বার ছুড়ি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। বোনের অপরাধ ছিল সে নাকি পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। আহমেদকে যখন আদালতে নেয়া হয় তখন সে ক্রমাগত বলতে থাকে যে আফগান আদালত হলে সে সহজেই ছাড়া পেয়ে যেত।

১৯৯৮ সালে শুধু পান্ঞাবেই ৮৮৮ জন নারী অনার-কিলিং এ স্বীকার হন। ১৯৯৭ সালে সিন্ধু প্রদেশে ৩০০ নারীর প্রাণ হরণ করা হয়।

অনার-কিলিং এর প্রবণতা ইসলামী সমাজে সবথেকে বেশী্। ইউরোপে যেসব ঘটনা ঘটছে তার মুলে প্রধানতা বাইরে থেকে আসা মুসলিমরাই। ২০০৭ সালে কানাডার মেমোরিয়াল ইউনিভার্সটির এক রিসার্চে বলা হয়, “যখন বাইরে থেকে মানুষ কানাডায় আসে তখন সাথে করে নিয়ে আসে তাদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, কিছু সংস্কৃতির মানুষ মনে করে যে নির্দিষ্ট কিছু সীমা কখনোই অতিক্রম করা যাবেনা, কেও যখন তা করে তখন হত্যার মাধ্যমে তারা সেটার শাস্তি দেয়”। সহজেই বোঝা যায় কেন মুসলিমদের মধ্য অনার-কিলিং এর প্রবণতা সবথেকে বেশী,বর্তমান বিশ্বে গোরামী আর অনমনীয় নিয়ম-কানুন, সহনশীলতার অভাব এদের মধ্যেই সবথেকে বেশী। গোড়া হিন্দুদের মধ্যেও অনার-কিলিং এর প্রবণতা বেশী। সতীদাহকে এক ধরনের অনার-কিলিং এর মধ্যে গণ্য করা হয়, সতীদাহ আত্মহত্যা নয়, সতীদের আগুনে পুড়ে মরতে বাধ্য করা হত। ব্রিটিশরা আসার পর সতীদাহ নিষিদ্ধ হয় কিন্তু বিংশ শতাব্দিতেও সতীদাহের ঘটনা ঘটেছে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে ৪০টি সতীদাহের ঘটনার কথা জানা যায়, বেশীভাগ ঘটেছে রাজস্থানে। উত্তর ভারতে ভাগলপুর অনার-কিলিং এর জন্য কুখ্যাত। ২০০৮ সালে এক বাবা তার কুড়াল দিয়ে তার মেয়ের শিরোচ্ছেদ করে।

২০০৫ সালে ডেনমার্কে গাজালা খান(Ghazala Khan) নামক এক নারীকে হত্যা করা হয় পরিবারে অমতে বিয়ের অপরাধে। তার বাবা এ হত্যার নির্দেশ দেন, এবং পরিবারে ৯জন মিলে হত্যার আয়োজন সম্পন্ন করে। Caneze Riaz নামক এক ব্যাক্তি তার স্ত্রী ও ৪ মেয়েকে ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। মুসলিম বংশদ্ভুত Hina Salem ইটালি গিয়ে সেখানকার সংস্কৃতির সাথে মিশতে চেষ্টা করেছিলেন, মেয়ের গলা কেটে তার বাবা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করান।

Birzeit University এর প্রফেসর শরীফ খান্নার মতে আরব সমাজের শিকড়ে অনার-কিলিং লুকিয়ে আছে, আরব সমাজে মেয়েদের শুধুই সন্তান জন্মানো কারখানা মনে করা হয়। শুধু শিক্ষার অভাব এর জন্য দায়ী বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেননা, তুরস্কে এক রিসার্চে দেখা গেছে ৬০ভাগ হত্যাকারী গ্র্যাজুয়েট বা হাই-স্কুল পাশ।

Sandeela Kanwal, কে তার বেডরুমে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার বাবা তাকে শক্ত রশি দিয়ে (bungee cord) দিয়ে বেধে রাখে কারণ সে স্বামীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে চেয়েছিল। ২০০৬ এর শেষের দিকে ইসরায়েলে একই কারণে এক মাকে তার দুই সন্তানের সামনে গুলি করি হত্যা করা হয়।

ইরানী বর্ডারে কাছে এক লোক তার স্ত্রীকে হত্যার পূর্বে চোখ তুলে নেয় ও জিহ্বা কেটে ফেলে। পরে সাংবাদিকদের সামনে সেই লোকের পিতা গর্বভরে তার ছেলের কাহিনী বলে। ভিডিওটি ইউটিউবে আছ, চাইলে দেখতে পারেন।

বাংলাদেশের দিকেই তাকাই। পরিবার, সমাজের সম্মানহানির কারণে কত মেয়ের প্রাণ হরণ করা হয়েছে তার হিসাব নেই। কাওকে হত্যা করা হয় শারীরিকভাবে, কাওকে মানসিকভাবে হত্যা করা হয় ভয়ংকর অপমান করে। শরিয়া আইন, ফতোয়া জারি করে মেয়েদের দোররা মারা, একঘরে করা খবর এখন আর আমাদের কাছে নতুন নয়।

চাইলে এরকম হাজার হাজার ঘটনা উল্লেখ করা যায়। গুগল এ অনার কিলিং লিখে সার্চ দিলে বিভৎস কিছু ঘটনা ও ছবি দেখতে পাবেন স্ক্রীনে। ২০১৪ সালেও কিছু জাতি বাস করে মধ্যযুগে, অন্ধবিশ্বাসের মোহে তারা কেড়ে নেয় হাজারো জীবন। এর জন্য দায়ী কারা? শুধুই এই মানুষগুলো নাকি এ অন্ধবিশ্বাস যারা ছড়িয়েছে তারা? উচ্চশিক্ষিত মানুষ যখন চোখ-কান বন্ধ করে এসব প্রথাকে প্রশ্রয় দিয়ে যায় তখন তাদের প্রতি ধিক্কার না জানিয়ে পারা যায় না। অন্ধবিশ্বাস যে কতটা ক্ষতিকর খুব বেশী মানুষ সেটা উপলব্ধি করতে পারেনা, যুক্তিহীন বিশ্বাস কখনোই পৃথিবীর জন্য ভাল কিছু আনতে পারেনি, কোনোদিন পারবেও না। যতদিন পর্যন্তনা মানুষ চিন্তা করতে শিখবে ততদিন অনার-কিলিং এর মত ঘটনা ঘটতেই থাকবে,শুধু আইন দিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ করা যাবেনা।

বাংলাদেশে এর কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও নিভৃতে প্রতিদিন যে কতো মেয়ে অনার কিলিংসহ তথাকথিত নানান সমাজিক অন্যায় চাপে মাথানত করে নিজস্ব সত্ত্বার বিসর্জন দিতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। জানিনা আর কতো মেয়েকে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করার অপরাধে এর শিকার হতে হবে। অনার কিলিং মানুষের ইতিহাসের এক অন্ধকার চলমান অধ্যায়, এ অধ্যায়ের শেষ কোথায়?