আজ থেকে শাকিব-অপুর বিচ্ছেদ: দুজনার দুটি পথ

rupcare_shakib apu divorce

দুজনের মনের বিচ্ছেদ হয়েছে আগেই। আজ [২২ ফেব্রুয়ারি] থেকে কার্যকর হলো আইনি বিচ্ছেদ। শাকিব খান-অপু বিশ্বাসের এক যুগের প্রেম, এক দশকের দাম্পত্য, লুকোচুরি, মান-অভিমান, সন্তান ও বিচ্ছেদের টালিখাতা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।

‘ভাইয়া’ দিয়ে শুরু

২০০৬ সাল। শাকিব খান তখনো আজকের মতো তারকাখ্যাতি পাননি। অভিনেতা-প্রযোজক ডিপজল বড় বাজেটের ছবি ‘কোটি টাকার কাবিন’-এ শাকিব খানকে সুযোগ দিলেন। বিপরীতে চাইলেন নতুন মুখ। ডাক পড়ল অপু বিশ্বাসের। আমজাদ হোসেনের ‘কাল সকালে’ ও সুভাষ দত্তের ‘ও আমার ছেলে’তে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করে বগুড়ায় ফিরে গেছেন অপু, আর অভিনয় করবেন না। এসএসসি পরীক্ষার পর তিন মাস গ্যাপ, ঠিক এ সময়ই সুযোগ পেলেন ‘কোটি টাকার কাবিন’-এ। অপু রাজি। শাকিবকে আগে থেকেই ভালো লাগে অপুর, তাঁর বেশ কিছু ছবি দেখেছেন। তবে শুটিংয়েই প্রথম সামনা-সামনি শাকিবকে দেখলেন। শাকিবকে ‘ভাইয়া’ ও ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করলেন অপু।

যেভাবে প্রেম

‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবির গানের শুটিংয়ের সময় একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কিন্তু কোনো কথা হতো না। একদিন ইশারায় অপুর ফোন নম্বর চাইলেন শাকিব। অপু লক্ষ করলেন, শাকিব ঘামছেন। হাতের কাছে টিস্যু পেয়ে তার ওপর আই লাইনার দিয়ে ফোন নম্বর লিখে শাকিবের হাতে দিলেন। কৌশলে শাকিব সেটা পকেটে ঢুকিয়ে নিলেন। রাতেই শাকিবের এসএমএস, ‘আমি রানা [শাকিবের ডাক নাম], ফোন রিসিভ করো।’ অপু তখন ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় থাকেন। সবার সামনে ফোন রিসিভ করা সম্ভব না। ওয়াশরুমে ঢুকে পানির কল ছেড়ে দিয়ে শাকিবের সঙ্গে কথা বললেন অপু। এভাবে দেড় মাস চলল ফোনে প্রেমালাপ। অপুর ভাষ্য, ‘রোমান্টিক সংলাপ বলার সময় মনে হতো আমি নিজের মনের কথাই শাকিবকে বলছি। এটা যে সিনেমার সংলাপ তখনো সেটা বুঝতে পারতাম না। শুটিংয়ের সে কয়টা দিন আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম।’

প্রেম প্রেম পাগলামি

ফোনে শাকিবের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মার কাছে ধরা পড়ে গেলেন অপু। শাস্তিস্বরূপ অপুকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ভারতে, বোনের বাসায়। সেখানেই পড়াশোনা করতে হবে, সিনেমায় আর অভিনয় করা যাবে না। ভারতে যাওয়ার পর আরো বেশি করে অপুর প্রেমে পড়ে গেলেন শাকিব। রাস্তার পাশের ফোন বুথ থেকে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে শাকিবকে ফোন করতেন অপু। প্রেমিকার ফোন পেয়ে ‘রসের বাইদানি’ ছবির শিডিউল ফাঁসিয়ে শাকিব চলে গেলেন ভারত। তাও বিমানে নয়, বাসে চড়ে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম হয়ে ভারতে ঢুকলেন। দেখা করলেন প্রেমিকার সঙ্গে, ঘুরতে গেলেন দার্জিলিং। যাওয়ার পথে কালীমন্দিরে ঢুকলেন তাঁরা। পুরোহিত জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কারা? একে অপরের কী হও? দুজনই একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী’। পুরোহিত তখন বললেন, কপালে সিঁদুর নেই কেন? বিব্রত শাকিব মন্দিরের এক কোণ থেকে সিঁদুর এনে পরিয়ে দিলেন অপুর কপালে। দেশে ফিরে যদিও শিডিউল ফাঁসানোর দায়ে বিপদে পড়তে হয়েছিল শাকিবকে। তত দিনে ‘কোটি টাকার কাবিন’ মুক্তি পেয়েছে, ছবি সুপারহিট। ডিপজল পর পর চারটি ছবির ঘোষণা দিলেন শাকিব-অপুকে নিয়ে। সিনেমা করলে শাকিবের কাছাকাছি থাকতে পারবেন, অপু ছবি করতে চাইলেন। কিন্তু পরিবারের কেউ রাজি নন। বিদ্রোহ করলেন অপু। দেশে ফিরে এসে বগুড়ার এক কলেজে ভর্তি হলেন। শাকিব তখনো শুটিং ফেলে কলেজের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

এবং বিয়ে

অপুর মা শাকিবের সঙ্গে মেলামেশা পছন্দ করেননি একেবারেই। একদিন শাকিবের মুখোমুখি হলেন। শাকিব বললেন, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করব। অপুর মা বললেন, আর সেদিনই আমি মেয়েকে ত্যাজ্য করব। শাকিব বিয়ের ডেট ফিক্সড করেন সেদিনই—১৮ এপ্রিল ২০০৮। দিনটা ঠিক করার কারণ, সেদিন শাকিবের বাবা-মা বাসায় থাকবেন না। শাকিবের ফুপাতো ভাই তানভীরের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাবেন। নির্ধারিত সময়ে কাজি ডেকে আনা হলো। অপু বিশ্বাস হয়ে গেলেন অপু ইসলাম খান। সেদিনের বিয়েতে ছিলেন অপুর মেজ বোন, শাকিবের কাজিন মুনির ও প্রযোজক মামুনুজ্জামান মামুন। বিয়ের পর অপু চলে গেলেন তাঁর বাসায়।

লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প

বিয়ের বিষয়টা শাকিবের বাবা-মা, অপুর মা জানতেন না। ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছাড়া চলচ্চিত্রেরও তেমন কেউ জানতেন না। বছরখানেক পর দুজন একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন। অপু বলেন, ‘যেন কেউ সন্দেহ করতে না পারে, সে জন্য শুটিংয়ের সময় শাকিবের ধারেকাছেও থাকতাম না। শটের সময় চলে যেতাম ক্যামেরার সামনে। অনেকের সন্দেহ হয়েছে; কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেননি। শুটিংয়ে শাকিবের সঙ্গে কথা না বললেও বাসায় ফিরে ঠিকই শাকিবের জন্য রাঁধতে বসে যেতাম।’ গণমাধ্যমে যখনই বিয়ের প্রসঙ্গ আসত দুজনই অস্বীকার করে বলতেন, ‘আমরা একে অপরের সহকর্মী। এর বেশি কিছু না।’ অপু তো প্রায়ই বলতেন, ‘শাকিবের জন্য মেয়ে পছন্দ করব আমি। বাসরও সাজাব নিজ হাতে।’

মান-অভিমান

সংসার শুরুর পর থেকেই তাঁদের মান-অভিমান চরমে ওঠে। ২০১০ সালে একবার এফডিসির ৮ নম্বর ফ্লোরে অপুকে নিয়ে বেশ উচ্চবাচ্য করলেন শাকিব। ঘোষণা দিলেন, আর অপুর সঙ্গে ছবি করবেন না। অভিমানের কারণ, অন্য এক নায়কের সঙ্গে কথা বলেছেন অপু। রঙের মেলায় তাঁদের এই মান-অভিমান নিয়ে ছাপা প্রতিবেদনে তৎকালীন শিল্পী সমিতির সভাপতি প্রয়াত মিজু আহমেদ বলেছিলেন, ‘ওরা প্রায়ই এ রকম করে। আবার ঠিকও হয়ে যাবে।’

দ্বন্দ্বের শুরু

তিনবার অন্তঃসত্ত্বা হন অপু, তিনবারই গর্ভপাত করান শাকিব। চতুর্থবার ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের চিকিৎসক বললেন, এবার গর্ভপাত করালে আর কখনো মা হতে পারবেন না। সন্তান জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন অপু। এতে শাকিবের ধারণা হয়েছে, অপু তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করছেন। যেখানে তিনি বিয়ের খবরই কাউকে জানাননি, সন্তান হলে তিনি মুখ দেখাবেন কিভাবে। ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই শত্রুরা অপুকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন। শাকিবের বাড়ি থেকে চলে আসেন অপু।

অজ্ঞাতবাস

২০১৬ সালের মাঝামাঝি হঠাৎ নিরুদ্দেশ অপু। কোথাও তাঁকে খুঁজে পেল না গণমাধ্যম। ‘সম্রাট’ ও ‘রাজনীতি’ ছবি দুটি গেল আটকে। শাকিবকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, ‘অপুর খবর আমি জানব কিভাবে? সে তো আমার বিয়ে করা বউ নয়।’

বোমার নাম ‘লাইভ’

১০ মাস পর ১০ এপ্রিল ২০১৭-তে নিউজ টোয়েন্টিফোর টিভি চ্যানেলের লাইভে শিশুপুত্র আবরাম খান জয়কে কোলে নিয়ে এলেন অপু। কান্নায় ভেঙে পড়েন লাইভেই। জানালেন ৯ বছরের সংসার ও সন্তানের কথা। লাইভে আসার নেপথ্যে ছিলেন আরেক নায়িকা শবনম বুবলি। তাঁর সঙ্গে শাকিবের ঘনিষ্ঠতা মানতে পারেননি অপু। আরেকটা কারণ, পুত্রকে নিয়ে দুশ্চিন্তা, যদি জয়কে অস্বীকার করেন শাকিব!

কথা চালাচালি

সেই বোমা ফাটানো লাইভের পর গণমাধ্যমে চলতে থাকে কথা চালাচালি। দুজনই পালা করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন। শাকিব প্রথমে বললেন, ‘ছেলের দায়িত্ব নেব, অপুর দায়িত্ব নেব না।’ জনমত উল্টে যাওয়ার পর এক পাঁচতারা হোটেলে অপু ও জয়ের সঙ্গে গিয়ে ছবি তুললেন। জানালেন, ‘আমরা আবার এক হয়ে গেছি।’ কিন্তু অপু জানালেন, তিনি একাই থাকছেন জয়কে নিয়ে। পুত্রের প্রথম জন্মদিনে অপু যখন শাকিবকে ছাড়াই জন্মদিনের আয়োজন করেন তখনই বিষয়টা স্পষ্ট হয়।

বিচ্ছেদ

জয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের পরই গুজব ওঠে শাকিব-অপুর বিচ্ছেদের। অবশেষে ২২ নভেম্বর অপুর ঢাকার বাসা ও বগুড়ার বাসায় তালাকনামা পাঠান শাকিব খান। আজ [২২ ফেব্রুয়ারি] থেকে কার্যকর হলো তাঁদের বিচ্ছেদ।

কী ভাবছেন শাকিব-অপু

আমি এখন স্বাধীন

শাকিব খান

আমি আসলে এ বিষয়ে তেমন কিছুই বলতে চাই না। আগামীকাল ফিল্মক্লাবের একটা প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আছে, সেখানে খেলব। বুঝতেই পারছেন, এসব আমার মাথায় নেই। বলতে পারেন আমি এখন স্বাধীন। বিষয়টি নিয়ে অনেক জল ঘোলা করার চেষ্টা করা হয়েছে। একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছিল আমার জনপ্রিয়তা নষ্ট করার। ষড়যন্ত্রকারীরা এখন মুখ লুকিয়েছেন। তবে এই ফাঁকে বুঝেছি, ইন্ডাস্ট্রিতে কারা আমার শত্রু আর কারা মিত্র। টানা দুই মাস দেশের বাইরে ছিলাম, ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরেছি। এসেই এফডিসিতে ‘চিটাগাইঙ্গা পোয়া নোয়াখাইল্লা মাইয়া’ ছবির শুটিং করছি। কে কী করল, কী ভাবল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। এসব নিয়ে মাথা ঘামানোটা অনর্থক। আমি আছি কাজ নিয়ে।

অভিনয় আর জয়কে নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে চাই

অপু বিশ্বাস

আমি সংসার টেকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সালিসি বৈঠকে হাজির হয়েছি। কিন্তু যাকে ভালোবেসে সংসার আগলে রাখতে চাই সে-ই আমাকে চায় না। বাধ্য হয়েই ডিভোর্স মেনে নিয়েছি। জয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর মামলা-মোকদ্দমা করতে যাইনি। পুরনো কাসুন্দিও আর ঘাঁটতে চাই না। কারণ জয় বড় হলে বিভিন্ন ধরনের কথার সম্মুখীন হবে ও। আমি চাই আমার ছেলে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকুক। মাত্র এক বছর বয়সেই সে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে সেটা অক্ষুণ্ন থাকুক। অভিনয় আর জয়কে নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে চাই।

কী আছে জয়ের ভাগ্যে?

‘জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ সিরিয়াস। সে আমার ছেলে। আমি প্রতি মাসে তাঁর খরচ দিয়ে যাব। ওকে পেতে হলে একটা সময় পর্যন্ত তো আমাকে অপেক্ষা করতেই হবে!’

শাকিব খান

জয়ের ব্যাপারে কেউ নাক গলাতে এলে ছেড়ে কথা বলব না। জয় পৃথিবীতে আসুক এটাই তো শাকিব চায়নি, সে কারণেই তো বিচ্ছেদ! এখন ও যদি মনে করে দু-দিন পরে এসে ছেলেকে নিয়ে যাবে, তা হবে না। এই জীবন থাকতে কোনোভাবেই আমি জয়কে হারাতে দেব না।

অপু বিশ্বাস

শাকিব-অপু জুটি

৭২টি ছবিতে অভিনয় করেছেন শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস জুটি। প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি ‘কোটি টাকার কাবিন’, সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘রাজনীতি’।

সেরা ১০ ছবি

কোটি টাকার কাবিন [২০০৬]

তুমি স্বপ্ন তুমি সাধনা [২০০৮]

মন যেখানে হৃদয় সেখানে [২০০৯]

ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না [২০১০]

নিঃশ্বাস আমার তুমি [২০১০]

এক টাকার দেনমোহর [২০১১]

দেবদাস [২০১৩]

হিরো দ্য সুপারস্টার [২০১৩]

লাভ ম্যারেজ [২০১৫]

রাজনীতি [২০১৭]

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedin