ঊর্ধ্বগগণের অকুতোভয় এক প্রাণ

|রূপ-কেয়ার ডেস্ক|
paratruper

গত মঙ্গলবার, ১২ই ফেব্রুয়ারী ২০১৩ একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে প্যারাট্রুপার বা ছত্রীসেনা হিসেবে এই প্রথমবার নাম লেখালেন কোনো একজন নারী সদস্য।

সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস মঙ্গলবার সকালে সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসের কাছঅকাছি পানিছড়া এলাকায় বিমানবাহিনীর একটি বিমান থেকে প্যারাসুটের মাধ্যমে সফলভাবে মাটিতে অবতরণের মধ্য দিয়ে এই সম্মান অর্জন করলেন।

সকাল থেকেই প্যারাট্রুপার দলের সদস্যরা অনুশীলনে ব্যাস্ত ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা উড়োজাহাজে আকাশে উড়লেন ভূমিতে ঝাঁপ দেয়ার জন্য । এই দলের চল্লিশ জনেরও বেশি সদস্যের সবাই পুরুষ, শুধু একজন ছাড়া। আর তিনিই জান্নাতুল ফেরদৌস।

কিন্তু প্যারাট্রুপার হিসেবে নিজেকে গড়ার স্বপ্ন কীভাবে তৈরি হলো? আর এই কাজটাকেই বা কতটা ঝুঁকির বা চ্যালেঞ্জের মনে হয় ?

পাঁচ সপ্তাহের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে দিনে ও রাতে মোট সাতবার আকাশ থেকে নেমে আসতে হয়। এক হাজার ফুট উঁচু থেকে এই অবতরণের ঠিক পরমুহুর্তেও রোমাঞ্চ প্রকাশ পায় বাংলাদেশের এই একমাত্র নারী ছত্রীসেনার কন্ঠে।paratruper2

একজন পুরুষ সদস্য জাম্প করে নিচে পড়ার সময় তার প্যারাস্যুট খুলতে না পারায় সমবেত সকলের উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। তবে শেষ মুহুর্তে অতিরিক্ত প্যারাশুটটি খুলতে পারায় বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পান তিনি। কিন্তু জান্নাতুল হাজার ফুট ওপর উচ্চতা থেকে কয়েক মিনিটে নিচে নেমেই জানালেন আরেকবার এভাবে নামতে পারলো মন্দ হতো না। সহাস্যে তিনি বলেন ‘মনে হচ্ছে আরেকবার জাম্প দিই।’

ক্যাপ্টেন জান্নাদুল ফেরদৌস ২০০৮ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৫৯তম ব্যাচের ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং বর্তমানে তিনি বিএমএ-এর একজন কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।

বাবা জিয়া সার কারখানার অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা আর মা গৃহিণী। জান্নাতুলরা তিন বোন, দুই ভাই। প্রথম দিকে কিন্তু বাবা-মার অনীহা ও দুশ্চিন্তা ছিল। “বাবা-মা বলতেন কেউ তো যায়নি তুমি কেন? আমি বলতাম কাউকে না কাউকে তো যেতে হবে। ভয়ের কিছু নেই।’’ জান্নাতুলের কথায়, “পরে একটু একটু করে তাদের মধ্যে সাহস তৈরি হয়। এখানকার প্রশিক্ষকদের সহায়তাও এখানে ভূমিকা রাখে”।

ক্যাপ্টেন জান্নাত প্রথমবার সফলভাবে আকাশ থেকে এভাবে নেমে আসেন গত ৫ই ফেব্রুয়ারি। শুরুর দিকে কিছুটা ভয় লাগলেও প্রশিক্ষণ শেষে বিষয়টাকে অনেক রোমাঞ্চকর বলে মনে হচ্ছে তার কাছে। তার সাথে আরো একজন নারী সদস্য প্রশিক্ষণ শুরু কররেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে মাঝপথে থেমে যেতে হয় । সিলেটের পানিছড়ার যে এলাকায় ওই প্রশিক্ষণ চলছিল সেখানে সামরিক বাহিনীর কমকর্তাদের পাশাপাশি এসেছিলেন স্থানীয় অনেক লোকজনও। তারাও একজন নারীকে এমন চ্যালেঞ্জ নিতে দেখে অভিভূত। তাদের মধ্যে অনেকেই ক্যাপ্টেন জান্নাতকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করলেন।

paratruper3জান্নাতুল ফেরদৌস নিজেও আশা করেন, সামনের দিনগুলোতে তাকে দেখে আরো অনেকেই উৎসাহী হবেন। তবে নারী হিসেবে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা থাকায় সেই বিষয়টি বিবেচনা করেই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয় বলে জানান তার প্রধান প্রশিক্ষক। তিনি মনে করেন জান্নাতের এই অর্জন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্য একটি মাইলফলক।

মঙ্গলবার সপ্তম দিনের মতো প্যারাট্রুপিংএর মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয় জান্নাতুল ফেরদৌসের। এর পর অন্যান্য পুরুষ সহকর্মীদের সাথে তাকেও ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হয় এবং এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দলের একজন সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, যে কিনা স্থল, নৌ এবং আকাশ সবদিকেই চৌখস ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেন। তাঁর এই সাফল্যে আমরা প্রাণভরে তাকে অভিনন্দন জানাই।

– বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে লিখেছেন নুসরাত নীলিমা।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedin