জমজমাট পুরান ঢাকার বাহারি ইফতার বাজার

|রূপ-কেয়ার ডেস্ক|

rupcare_iftar3

ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার ইফতারির কদর বহুকাল আগে থেকেই তা সবারই জানা । নানা অনুষঙ্গ, বাহারি নাম আর লোভনীয় স্বাদের জন্য অনেকে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে যান সেখানে। চকবাজারে প্রথম রমজান থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত বসবে এই ইফতারির বাজার। আরও বসবে ঢাকাইয়া রন্ধনশিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী নানা ইফতারির পসরা।

এই ইফতারির বাজারে একটি বিখ্যাত নাম ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। ১২৫ বছর আগে কালেম মিয়া নামে এক বাবুর্চি এই খাদ্য তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। বংশানুক্রমে তার ছেলে জানে আলম থেকে সালেকিন মিয়ার হাত পেরিয়ে এখন চলছে সেন্টু মিয়ার যুগ। সেন্টু মিয়া এ কাজ করছেন প্রায় ৩০ বছর ধরে। তবে এই পরিবার ছাড়াও অনেকে তৈরি করছে এখন ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।

url
তেমনি একজন সেকেন্দার আলী (৭০), তার ছেলে ও ভাইপোদের নিয়ে দু’টি দোকানে আজ থেকে বিক্রি শুরু করবেন ইফতারি। মানবজমিনকে তিনি বলেন, এটা পুরাণ ঢাকার ঐতিহ্য। তা ধরে রাখতেই আমরা চেষ্টা করছি। তবে ছেলেরা এখন আর কষ্ট করতে চায় না। চার ছেলের তিনজনই বিদেশে গেছে। এক ছেলে আছে এই ব্যবসায়। বৃদ্ধ বয়সেও ঐতিহ্যের টানে তিনি ছাড়তে পারছেন না এই কাজ। বাবুর্চি হাজী শহীদও এই পণ্যের একচেটিয়া ব্যবসায়ী বলে জানা গেছে।
এক কালে ‘বড় বাপের পোলার’ দাম ছিল প্রতি কেজি ১৬ টাকা। গতবছর বিক্রি হয়েছে ৩৬০ টাকায়। এ বছরও প্রায় একই দাম থাকবে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বুটের ডাল, চিড়া, মুরগি-কবুতর-কোয়েল-খাসির মাংস, গরুর মগজ, কলিজা, ডিমের সঙ্গে প্রায় ৩৫ প্রকারের উপকরণসহ ৪২ প্রকারের মশলা মিশিয়ে তৈরি হয় এ খাবার। এর মধ্যে চার প্রকারের মশলার নাম জানে না কেউ। এটা যেন ‘সিক্রেট অ্যান্ড ইনগ্রেডিয়েন্ট’। জিহ্বায় পানি আসা এই অভিজাত খাবার কিন্তু বারমাস পাওয়া যায় না। কেবল রমজান মাসেই পুরাণ ঢাকায় এর খোঁজ মেলে। চকবাজারে মসজিদ রোডের আশপাশের এলাকায় রমজানের বিকালে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েই চলে ইফতারির পসরা বিক্রি। সেখানে শোনা যাবে ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গা ভইরা লইয়া যায়/ ধনী গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’।

লাইন দিয়ে দোকান বসে সেখানে। এ ছাড়াও পাওয়া যায় অন্যান্য রকমারি নানা আইটেম। আস্ত মুরগি, খাসির রোস্ট, কিমা। খাসির রান, কোয়েল, কবুতর ভুনা, পেয়াজু, বেগুনি, ঘুগনি, মোরগ পোলাও, শাহী জিলাপি, পেস্তা বাদামের শরবত, সুতি কাবাব, টিকা কাবাব, শাকপুলি, জালি কাবাব, আলুর চপ, দইবড়া, মাঠাসহ নানা আইটেম সেখানে বিক্রি হবে। বড় বাপের পোলার মতো শাহী জিলাপিরও রয়েছে আলাদা নাম-ডাক।

391706_478957548799124_1895891338_n
এখানকার শাহী জিলাপির রয়েছে নানা স্বাদ এবং আকার। ‘জাম্বু’ সাইজের শাহী জিলাপির একটির ওজন আধা কেজি থেকে পাঁচ কেজি। ১৬০ টাকা প্রতি কেজি। এরকমই আরেক জিলাপির নাম ‘রসবড়ি’, তৈরি হয় হাজী মইনুদ্দিন মিষ্টান্ন ঘরে। সেখানে তৈরি হয় এরকম আরও ১২ প্রকারের জিলাপি। রমজানের আগের দিনই দোকানদাররা সামিয়ানা টানিয়ে জায়গা দখল করেছেন। তবে জমজমাট বলতে যা বুঝায় তা দেখা যাবে আজ থেকেই। প্রায় পাঁচ শতাধিক ছোট বড় অস্থায়ী দোকান বসবে এখানে। কেউ নিত্যদিনের ইফতারের খোঁজে সেখানে যাবেন। কেউ যাবেন শখের বসে কদাচিৎ।

নুরুল ইসলাম নামে এক দোকানদার জানান, ইফাতারির বাজারে নতুন কোন জিনিস নেই। তবে ঐতিহ্যবাহী সব জিনিসই প্রতিবছরের মতো এবারও পাওয়া যাবে। ইফতারির বাজারে আসা নানা পণ্যের মধ্যে ভেজাল আর ভাল বাছাই করার কোন উপায় নেই। দূর-দূরান্তের মানুষও এখানকার বাসিন্দারা ইফতার কেনে। বিগত বছরের মতো মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে ভোজাল রোধে ভূমিকা রাখা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয়রা।