দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা কেন সন্তান নিতে চান না

সন্তান না নেওয়ার প্রবণতা দক্ষিণ কোরিয়ান নারীদের মধ্যে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কোরিয়া এখন বিশ্বের সবচেয়ে নিম্ন জন্মহারের দেশে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে দেশটির জন্মহার মাত্র ১.২। এ অবস্থা চলতে থাকলে দক্ষিণ কোরিয়া কর্মক্ষম জনসংখ্যার সংকটে পড়বে। কিন্তু কেন দেশটির নারীরা সন্তান জন্মদানে এতটা অনাগ্রহী?

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় সব তরুণীর মতো ২৪ বছর বয়সী জ্যাং ইয়ুন-হুয়ারও সন্তান নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যে দীর্ঘ শারীরিক কষ্ট ভোগ করতে হয়, সেটি চান না তিনি। এর চেয়ে বরং নিজের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চান তিনি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির এ দেশটিতে একটি ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ পরিশ্রম করতে হয়। জ্যাং ইয়ুন-হুয়াকেও এ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে তিনি এখন ওয়েব কমিক আর্টিস্টের মতো একটি ভালো চাকরি করেন। কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে তিনি তার সব পরিশ্রম ব্যর্থ হতে দিতে ইচ্ছুক নন।

ইয়ুন-হুয়ার বলেন, ‘কোনো পরিবারের অংশ হওয়ার চাইতে আমি একা এবং স্বাধীন থাকাটাকেই বেশি প্রাধান্য দেই। এভাবেই আমি আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চাই।’

দেশটির প্রায় সব তরুণী এভাবেই ভাবেন। একই সঙ্গে পরিবার এবং ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছুক নয় কেউই। বরং সবাই পরিবার বাদ দিয়ে ক্যারিয়ারকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

যদিও দক্ষিণ কোরিয়ার আইনে আছে, গর্ভবতী কোনো নারীর সঙ্গে কোনোরূপ বৈষম্য করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে এসব মানা হয় না। কর্পোরেট জীবনে নারীদের গর্ভবতী হওয়াটাকে তাদের চাকরির জন্য একটা অভিশাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি চাকরিচ্যুতও করা হয় তাদেরকে।

যেমন চই মুন-জেয়ংয়ের কথাই ধরুন। তার অভিজ্ঞতা জানতে পারলে পুরো চিত্রটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। গর্ভবতী হওয়ার পর মুন-জেয়ং তার বসের কাছে ছুটি চাইতে যান। তার বস এটি শুনে বাজেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান।

বস মুন-জেয়ংকে বলেন, ‘আপনার সন্তান হলে সে-ই আপনার কাছে বেশি প্রধান্য পাবে। প্রাধান্যের দিক থেকে কোম্পানি তখন দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাবে। আপনি কি তাহলে ঠিকভাবে চাকরি করতে পারবেন?’

তিনি বারবার এ প্রশ্নটিই করছিলেন। বসের প্রশ্ন শুনে মুন-জেয়ংয়ের অস্বস্তি শুরু হতে লাগল। তার মুখে রক্ত জমাট বাধতে আরম্ভ করল। তিনি যখন চেয়ার থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন, তখন সহকর্মীরা তাকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠান। ডাক্তার তাকে জানান, অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে তার গর্ভপাত হয়ে যেতে পারতো। অল্পের জন্য তিনি গর্ভপাতের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

এক সপ্তাহ হাসপাতালে থেকে গর্ভপাতের হাত থেকে মুক্তি পেলেও অফিসে ফেরার পর থেকেই বসের আচরণে পরিবর্তন দেখতে পান। তিনি যাতে নিজে থেকেই চাকরিটি ছেড়ে দেন, সেজন্য বস সবধরনের চেষ্টা শুরু করে দেন।

চই মুন জেয়ং। ছবি: বিবিসি

মুন জেয়ং বলেন, ‘তার সঙ্গে যা হয়েছে, এটা মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সব বসই এমনটা করেন। আমার মনে হয় অনেক নারীই নিজেদের গর্ভাবস্থার কথা প্রকাশ করতে ভয় পান। আমার আশপাশে অনেকেরই কোনো সন্তান নেই এবং সন্তান নেওয়ার কোনো পরিকল্পনাও তাদের নেই।’

কঠোর পরিশ্রম ও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার জন্য পৃথিবীব্যাপী দক্ষিণ কোরিয়ানদের সুনাম আছে। কোরিয়ানদের এ কঠোর পরিশ্রমের জন্যই গত ৫০ বছরে অর্থনৈতিকভাবে দেশটি অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু ইয়ুন-হুয়া বলছেন, এ অভাবনীয় সাফল্যে নারীদের অবদান প্রায়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘কারখানাগুলোতে সস্তা শ্রমিকের সহজলভ্যতার কারণে দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিকভাবে এত সাফল্য পেয়েছে। এসব সস্তা শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী। আবার পরিবারে নারীরা যে সেবামূলক কাজ করছে, তার ফলেই পুরুষরা বাইরে গিয়ে ঠিকভাবে কাজ করতে পারছে।’

এখন দেশটির নারীরা উচ্চপদস্থ অনেক চাকরি করছে, যেগুলো আগে পুরুষরা করতো। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে গেলেও নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টি-ভঙ্গির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ইয়ুন-হুয়া বলেন, ‘পুরুষদের কাছে নারীরা মূলত চিয়ারলিডারদের মতো। পুরুষরা ভাবে, তাদের স্ত্রীরা তাদের এবং তাদের পরিবারের সেবাযত্ন করবে। এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে চাকরিজীবী নারীদের বিয়ের পর যখন সন্তান হয়, তখন তার পুরো দায়িত্ব ওই নারীটিকেই নিতে হয়। এমনকি তাদের স্বামীর পরিবারের যদি কেউ অসুস্থ হয়ে যায়, তাহলে তারও সেবাযত্ন করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এসব যায় না। আমি আমার জীবন নিয়েই ব্যস্ত।’

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) দেওয়া তথ্যে জানা যায়, একজন দক্ষিণ কোরিয়ান পুরুষ প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১৫ মিনিট অবৈতনিক কাজ করেন। সেখানে একজন নারীকে তার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি সময় সেবামূলক বা পরিবারের কাজ করতে হয়।

ইয়ুন-হুয়া যে শুধু বিয়ে করতে চান না, তেমনটি নয়, তিনি কোনো প্রেমিক বা ছেলে সঙ্গীও চান না। কারণ প্রেমিক থাকলেই বিদ্বেষমূলক যৌন সহিংসতার (রিভেঞ্জ পর্ন) শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যেটি দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবল। এমনকি বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

দ্য কোরিয়ান ইনস্টিটিউট অব ক্রিমিনোলজির গত বছর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ৮০ ভাগ পুরুষ তাদের প্রেমিকা বা স্ত্রীদের ক্ষেত্রে অপমানজনক আচরণ করেছে বা তেমন ভাষা ব্যবহার করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষরা নারীদের কীভাবে দেখে, এমন প্রশ্নের উত্তরে ইয়ুন-হুয়া এক শব্দে জবাব দেন, ‘দাস’।

নারীদের সন্তান না নেওয়ার প্রবণতার কারণে দেশটিতে ইতিমধ্যেই শিশুদের সংখ্যা কমে গেছে। প্রতি এক হাজার দক্ষিণ কোরিয়ানের মধ্যে মাত্র ৫.৫ জন বিয়ে করেন। রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে এ সংখ্যা এখনই সবচেয়ে কম। ১৯৭০ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রতি হাজারে ৯.২ জন। বিয়ের বাইরে সন্তান জন্মদানের হারও খুবই নগন্য।

বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুসারে সিঙ্গাপুর, হংকং এবং মালদোভার জন্মহারও দক্ষিণ কোরিয়ার সমান (১.২)।

এসবের বাইরে সন্তান লালনপালনের অতিরিক্ত খরচের কারণেও অনেকে সন্তান নিতে চান না। দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশুদের জন্য পড়াশোনা সম্পূর্ণ ফ্রি। কিন্তু বাবা-মায়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে তারা তাদের সন্তানদের জন্য আলাদা টিউশনের ব্যবস্থা করেন, যেটা খুবই ব্যয়বহুল।

এ সবকিছু মিলিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় এক ‘স্যাম্পো প্রজন্ম’ তৈরি হয়েছে। যারা সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তানে আগ্রহী নয়, তাদেরকে এক শব্দে বোঝাতে ‘স্যাম্পো’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

দেশটির বয়স্ক নাগরিকরা তরুণদের সন্তান না নেওয়ার এ প্রবণতায় উদ্বিগ্ন। ৬০ বছর বয়সী একজন নারী ইয়ুন-হুয়ার মতো বর্তমান প্রজন্মের কোরিয়ান নারীদের আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর হিসেবে অভিহিত করেন। এ নারী নিজেও তিন মেয়ের মা। তার মেয়েদের সবার বয়স ৪০ বছর পার হয়ে গেলেও তাদের কেউই সন্তান নেননি।

তিনি বলেন, ‘দেশকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে নিজের সন্তানকেও ভালোবাসা সম্ভব। আমি এমন ধারণাই মেয়েদের মধ্যে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাদেরকে রাজি করাতে পারিনি। আমি আমাদের দেশের জন্মহার নিয়ে খুবই শঙ্কিত।’

যদি ইয়ুন-হুয়ার মতো সবাই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তো দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যাবে, দেশটি ভবিষ্যতে গভীর সংকটে পতিত হবে। তখন কী হবে?

এ প্রশ্নের জবাবে বয়স্ক ওই নারী বলেন, ‘সমাজ থেকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দূর করতে হবে। অবশ্যই দূর করতে হবে।’