প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর যা ভাবছে কোটাধারীরা

11-04-18-pm-parliament-02-527735838


কোটাধারীরা মনে করছেন, কোটা বিলুপ্ত করা ঠিক হবে না। তবে তারা কোটা হার কমিয়ে আনা বা সংস্কারের পক্ষপাতী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। ১১ এপ্রিল, বুধবার রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আন্দোলনকারীদের বারবার বলতে শোনা যায়, তারা কোটা ব্যবস্থার বাতিল নয়, সংস্কার চায়। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেন, আন্দোলনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের কোটাই বাতিল করা হবে। তবে প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হবে। তবে সেই বিশেষ ব্যবস্থা কী, তা তিনি পরিষ্কার করেননি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোটা সুবিধা ভোগকারী ও সংশ্লিষ্টরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করছেন, কোটা বিলুপ্ত করা ঠিক হবে না। তবে তারা কোটার হার কমিয়ে আনা বা সংস্কারের পক্ষপাতী, যে দাবিতেই আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা ৩০, নারী ১০, উপজাতি ৫, প্রতিবন্ধী ১, জেলার জন্য ১০ ভাগ কোটা রয়েছে। এ ছাড়াও সরকারি চাকরিতে মোট ২৫৩ ধরনের কোটা রয়েছে।
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির মনে করেন, কোটা কমানো দরকার, তবে বিলুপ্ত করা উচিত নয়।
যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ তাদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত উল্লেখ করে রোকেয়া কবির বলেন, ‘ছাত্ররা আন্দোলন করছিল কোটা সংস্কারের, বাতিলের নয়। মুক্তিযোদ্ধা ও নারী কোটা অনেক বেশি, এখানে এটা কমিয়ে আনার বিষয় ছিল। এ দেশের আপামর মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। রাজাকার-আলবদর বাদে বাকি সবাই মুক্তিযোদ্ধা।
এখন আমাদের দেখতে হবে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা অনেক পেয়েছি। এদের জন্য কোনো কোটা রাখার পক্ষপাতী আমি না। এমন মানুষদের অর্থনৈতিক কোটা সুবিধা দেওয়া উচিত, যারা অর্থনৈতিকভাবে খারাপ অবস্থায় ছিলেন, এখনো আছেন। মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের কোটা সুবিধা দেওয়ার এই অবস্থাতে না যাওয়া উচিত।’
তবে নারীদের ক্ষেত্রে অল্প মাত্রায় কোটা সুবিধা দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন রোকেয়া কবির। তিনি মনে করেন, নারীদের ডে-কেয়ার সেন্টার, যাতায়াত, স্বাস্থ্য, বয়স্ক ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার। শুধু সরকারি চাকরিতে নারীদের কোটা না। তবে নারীদের কোটা থাকলে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত থেকেও নারীরা আসবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১৩ এপ্রিল, শুক্রবার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে চাকরিতে ৩০ ভাগ কোটা সুবিধাভোগী মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সমাবেশ করে পরবর্তী সময়ে তাদের করণীয় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. হুমায়ুন কবির ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নয়ন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশের উদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই নিয়েছেন। তবে, আমরা চাই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যে সম্মান জাতির জনক দিয়েছেন, তার স্মৃতিচিহ্নিটি যেন তারই কন্যার হাত দিয়ে নষ্ট না হয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর কন্যা আমাদেরকে বিমুখ করবেন না।’
প্রতিবন্ধীদের জন্য এক ভাগ কোটা রয়েছে। যদিও এই এক ভাগ কোটা পূরণ করার বাধ্যবাধকতা নেই। এই কোটা বাধ্যতামূলক করার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছিল প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলো। কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা বাতিল করে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ বিষয়ে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সাবেক সভাপতি খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা আমি শুনলাম। উনি বলেছেন, প্রতিবন্ধী ও নৃ-তাত্ত্বিক যারা আছেন, তাদের কী উপায়ে স্বার্থ সুরক্ষা করা যায়, সেটা তারা দেখবেন। এ বিষয়টা এখনো পরিষ্কার না। আরও একটি কথা বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি একটি কমিটি করেছেন। সেই কমিটি অচিরেই সিদ্ধান্ত দিবেন। আমার বিশ্বাস, প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখবেন উনি।’
জহুরুল আলম মনে করেন, প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোটা বা বিশেষ সুবিধা যা-ই হোক না কেন, একটা কিছু রাখতে হবে। এক ভাগ কোটা না দিলে তাদের পক্ষ চাকরি পাওয়া দুরূহ হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আদিবাসী ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি হেমন্ত মাহাত জানান, সংবিধানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠীর সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। কোটা ব্যবস্থা যদি তুলে দিতে হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে।
হেমন্ত মাহাত আরও জানান, বাংলাদেশ সরকার ক্ষদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য যে ৫ ভাগ কোটা দিয়ে আসছে, তা অনেক সংগ্রামের ফল। এখন এই কোটা যদি বাতিল করা হয়, তাহলে আদিবাসী মানুষরা শিক্ষিত হচ্ছিল, তারা পিছিয়ে পড়বে। তাই দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফলে অর্জিত কোটা পুনরায় ফিরিয়ে পেতে প্রয়োজনে তারা আবার আন্দোলনে যাবেন।