বাসচালকের সততায় সম্ভ্রম রক্ষা হলো কিশোরীর

rupcare_rape

চলন্ত বাসে কর্মজীবী নারী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা এখনো নাড়া দেয় দেশবাসীকে। গত আগস্টে এ ঘটনা ঘটেছিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে।

প্রায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছিল ঢাকার মহাখালীর একটি বাসে। কিন্তু বাসচালক ও তাঁর সহকারীর সততায় সম্ভ্রম রক্ষা হয়েছে ময়মনসিংহের নান্দাইলের এক কিশোরীর (১৫)। ১৬ ঘণ্টা পর গতকাল বুধবার সকালে কিশোরীটিকে অক্ষত অবস্থায় মা-বাবার হাতে তুলে দিয়েছেন বাসচালক ও সহকারী।

স্থানীয় সূত্র ও বাসচালক জানান, নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও থেকে অনন্যা পরিবহন নামে বেশ কিছুু বাস প্রতিদিন ঢাকার উদ্দেশে চলাচল করে। গত মঙ্গলবার সকাল ৮টায় অন্য যাত্রীদের সঙ্গে ‘অনন্যা’য় (ঢাকা মেট্রো জ-৩৯৬৫) ওঠে এক কিশোরী। বাসচালক মোশারফ হোসেন (৪০) জানান, বাসটি কিছু দূর যেতেই সুপারভাইজার ভাড়া চান। কিশোরী ২০০ টাকা ভাড়ার স্থলে ১০০ দিতে চাইলে তর্ক শুরু হয়। কিশোরী সুপারভাইজারের অনবরত তাগাদায় কাঁদতে থাকে। চালক সুপারভাইজারকে থামিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলেন।

পরে গন্তব্য ঢাকার মহাখালী টার্মিনালে পৌঁছলে বাসটি থেকে সব যাত্রী নেমে গেলেও কিশোরীটি নামেনি। মোশারফ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, সত্মায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সে পরিবারের সবার অজান্তে গ্রামের বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। সে আর বাড়ি ফিরে যাবে না। অন্য কোথাও চলে যাবে। মোশারফ কিশোরীকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ক্লান্ত শরীরে টার্মিনালে বাস রেখে বিশ্রামে চলে যান। ঘটনাটি টের পায় অন্য বাসের চালক, তাদের সহকারীরাসহ টার্মিনালে অবস্থান করা বখাটেরা। তারা ওই বাসের কাছে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে ফিসফাঁস ও বিভিন্ন মন্তব্য করতে থাকে। তখন মোশারফ বুঝতে পারেন, যেকোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। তিনি সহকারী স্বপনকে কিশোরীর কাছে পাঠিয়ে দেখভাল করার দায়িত্ব দেন এবং বলে দেন, কেউ জানতে চাইলে স্বপন যেন বলেন, ‘সে (কিশোরী) উস্তাদের (চালক মোশারফ) ছোট বোন। ’ বিকেল ৫টার দিকে মেয়েটি হঠাৎ অচেতন হয়ে বাসের সিটে শুয়ে পড়ে। ঘণ্টাখানেক সেবা-শুশ্রূষার পর চেতনা ফিরলে তাকে খাবার খাওয়ানো হয়। পরে মোশারফ কিশোরীকে বোন বানালে সে বাড়ি ফিরে যেতে চায়। এ অবস্থায় রাত ৮টার দিকে যাত্রী উঠিয়ে নান্দাইলের দিকে যাত্রা করে বাসটি। পথে মেয়েটি আবার জ্ঞান হারিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

চালক মোশারফ জানান, মেয়েটির অসুস্থতায় মোশারফ শঙ্কায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নান্দাইল কাউন্টারে এলে মেয়েটিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসায় শেষ রাতে মেয়েটির জ্ঞান ফিরলে তার ঠিকানামতো নান্দাইলের চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের একটি গ্রামে পরিবারের কাছে খবর পাঠানো হয়। মা-বাবা এসে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে যান।

মেয়েটির মা জানান, তাঁর মেয়ে একটি মাদরাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখার চাপ দেওয়ায় সে গত মঙ্গলবার সকালে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবার মহাচিন্তায় থাকলেও মান-সম্মানের ভয়ে কাউকে ঘটনা জানানোও হচ্ছিল না। তিনি মেয়েকে উদ্ধার করা চালকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশে এখনো ভালো মানুষ আছে, এটা বাসচালক মোশারফকে দিয়েই বলা যায়। ’

নান্দাইল থানার ওসি মো. ইউনুস আলী জানান, তিনি রাতে খবর পান অজ্ঞাতপরিচয় একটি মেয়ে অচেতন অবস্থায় নান্দাইল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পরে তিনি দ্রুত থানা থেকে ইমার্জেন্সি অফিসার পাঠান। জানতে পারেন, মেয়েটি রাগ করে বাসে করে ঢাকায় চলে গিয়েছিল। তাকে উদ্ধারসহ রক্ষা করেছেন বাসচালক। তিনি বাসচালক মোশারফের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedin