মান্নার মৃত্যুর পর একাই লড়াই করে যাচ্ছি, সাথে কেউ নাই: স্ত্রী শেলী

rupcare_manna wife

ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক মান্নার দশম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ১৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার। পারিবারিক উদ্যোগে তার উত্তরার বাসায় স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল। এ দিন বাদ মাগরিব মিলাদ ও দোয়া মাহফিলও হয়েছে। স্মরণসভায় চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা স্মৃতিচারণ করেন।

জনপ্রিয় এই নায়কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শনিবার একটি জনপ্রিয় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন নায়ক মান্নার স্ত্রী ও মান্না ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেলী মান্না।

আজ তো দশম মৃত্যুবার্ষিকী, কীভাবে স্মরণ করছেন…

শেলী মান্না: আমাকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও পরিচালক সমিতি থেকে বলা হয়েছিল এফডিসিতে বেশ বড় আয়োজন করবে আজ। তারপর আমি বললাম, আমাদের তো কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ড রয়েছে, সেখানে যাওয়া লাগবে। যার কারণে এফডিসিতে যাওয়া সম্ভব হবে না। তারপরও আমি বলেছিলাম, আপনারা করেন, পারিবারিকভাবে আমি বাসাতেই আয়োজন করছি। আজ মাগরিবের নামাজের পর উত্তরাতে আমাদের বাসাতেই স্মরণসভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

গণমাধ্যম: দেখতে দেখতে মান্নার মৃত্যুর পর দশটি বছর চলে গেল। যখন একাকী থাকেন, তখন মান্নার কথা মনে পড়লে ঠিক কেমন লাগে?

শেলী মান্না: আমি তো অবসর সময় খুব একটা পাই না। কারণ সব কিছুই আমাকে একা দেখতে হয়। মান্না চলে যাওয়ার পর গত দশ বছরে অনেকেই আমাকে কমিটমেন্ট দিয়ে রাখেনি। আন্তরিকতা বলেন, তারও কিছু পাইনি। মান্নার যারা কাছের মানুষ ছিলেন তাদের বেশিরভাগ মানুষেরই আমি নেগেটিভ রূপ দেখেছি, মান্না মারা যাওয়ার পরে। অথচ মান্না যখন জীবিত ছিলেন তখন ঠিক তার বিপরীত চেহারা ছিল। তারপর মান্নার মৃত্যুর পর আমি যে মামলাটি করেছি, সে বিষয়েও কাউকে কিছু বলতে দেখি না খুব একটা। আমি একাই লড়াই করে যাচ্ছি। আমারে সাথে কেউ নাই। প্রতিটা মুহূর্তেই আমি একা!

গণমাধ্যম: মান্নার মৃত্যুর পর তার স্মৃতি সংরক্ষণার্থে বিভিন্ন সময়ে নানান উদ্যোগের কথা শোনা গেছে। কিন্তু তারপর আর সে বিষয়গুলোয় খুব একটা অগ্রগতি দেখা যায়নি কেন?

শেলী মান্না: সবকিছু তো আর আমার একার পক্ষে দেখা সম্ভব না। কিছু কাজ করতে গেলে আমাকে কিছু মানুষের ওপর নির্ভর করতেই হবে। আর যাদের ওপর নির্ভর করতাম তাদের অনেকেই তো মারা গেছেন। যার কারণে আমাদের গ্রহণ করা সিদ্বান্তগুলোর বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। ফাউন্ডেশনটাকে আরেকটু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। সব মিলিয়ে আশা করছি ভালো কিছু একটা করতে পারব। এজন্য আমার আরেকটু সময় লাগবে।

গণমাধ্যম: আপনি সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নির্মাতা হিসেবে নয়, প্রযোজক হয়ে। এখন কী খবর?

শেলী মান্না: ওই যে বললাম, আমাকে একা সবকিছু সামাল দিতে হয়। যার কারণে আলাদা করে যে সিনেমাতে সময় দেবো, সেটাই হয়ে উঠছিল না। অন্যান্য কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। তাই ভাবছি সবকিছু গুছিয়ে আসছে এপ্রিলের আমরা নতুন সিনেমার ঘোষণা দেবো। একটা সময় শুধু সিনেমাকে ঘিরেই কত না সুন্দর সময় কাটিয়েছি! আজ মান্না নেই, সব কিছুতেই এক ধরনের ধূসরতা চলে এসেছে।

গণমাধ্যম: আচ্ছা, গত বছরের শেষের দিকে আপনার ছেলে অভিনয়ে আসবেন, এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

শেলী মান্না: পুরো বিষয়টি না জেনে কেউ যখন কোনো খবর লিখে ফেলে তখন তা নিয়ে এক ধরনের ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টি হবেই। তখনও তাই হয়েছে। কথাটা বলা হয়েছে একভাবে আর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে আরেকভাবে। তবে তেমন কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। সব কিছুরই তো একটা সময় থাকে। দেখা যাক। নতুন করে জীবনের চিত্রনাট্য লেখাটা তো খুব সহজ কাজ নয়।

গণমাধ্যম: মান্না বাংলাদেশের তুমুল জনপ্রিয় একজন নায়ক কিংবা তিনি বাংলাদেশের সিনেমা অঙ্গন একটা সময় শাসন করেছেন, অথচ মৃত্যুর পর তার পরিবারের কাউকে সেভাবে সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হতে দেখা যায়নি?

শেলী মান্না: মান্না যে জায়গাটাতে ছিল, মানে বলতে চাচ্ছি—ও তো পর্দার হিরো ছিল। সেখানে আমি! তার মানে আমাকে সিনেমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হতে হতো। কিন্তু কিছু কারণেই এর সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত হইনি। আমার ছেলের কারণেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে সিনেমার কিছু মানুষের সঙ্গে এখনও আমার নিয়মিত যোগাযোগ কিংবা আলাপচারিতা হয়। আর মান্নার প্রিয় এ জায়গাটি থেকে দূরে সরে যাওয়ার কিছু কারণও ছিল, সব কথা তো আর বলা যায় না।

গণমাধ্যম: মান্নার আত্মজীবনী কিংবা জীবনীগ্রন্থ লেখার বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?

শেলী মান্না: ওর আত্মজীবনী তো অনেকেই লিখতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো কিছুতে তথ্যগত দুর্বলতা থাকার কারণে সে বিষয়ে আর কথাবার্তা সামনে এগোয়নি। আর মান্নার মামলার রায়ের একটি বিষয় রয়েছে। ফাইনালি মামলার রায়ের ওপরই নির্ভর করছে আত্মজীবনীটা। আবার মান্নার ওপর কোনো ছবিও হতে পারে। আসছে এপ্রিলেই সব জানা যাবে। মান্নাকে নিয়ে আমার যে পরিকল্পনার কথা এত দিন বলেছি, যেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলো একটি একটি করে বাস্তবায়ন হবে।

এক নজরে মান্না

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ও একজন সফল প্রযোজকও ছিলেন মান্না। ১৯৮৪ সালে বিএফডিসি আয়োজিত নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মান্না চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। তার প্রথম অভিনীত ছবি ‘তওবা’ (১৯৮৪)। মান্না সাড়ে তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি হচ্ছে—‘সিপাহী’, ‘যন্ত্রণা’, ‘অমর’, ‘পাগলী’, ‘দাঙ্গা’, ‘ত্রাস’, ‘জনতার বাদশা’, ‘লাল বাদশা’, ‘আম্মাজান’, ‘দেশ দরদী’, ‘অন্ধ আইন’, ‘স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘অবুঝ শিশু’, ‘মায়ের মর্যাদা’, ‘মা বাবার স্বপ্ন’, ‘হৃদয় থেকে পাওয়া’ ইত্যাদি।

উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন মান্না। তার আসল নাম এস. এম. আসলাম তালুকদার।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedin