মিতানূরের আত্মহত্যার রহস্য কি চাপা পড়ে যাবে!

|গসিপ ডেস্ক|

নিজের কষ্ট নিজের মধ্যে রেখে মিষ্টি হাসি দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করে গেছেন জনপ্রিয় তারকা মিতা নূর। বাইরের কাউকে বুঝতে দেননি তার গোপন মনোকষ্ট। দাম্পত্য জীবনে অশান্তির আগুনে পুড়লেও ভাল থাকার অভিনয় করেছেন। শেষ পর্যন্ত পারলেন না। হেরে গেলেন স্বামীর অমানবিক নিপীড়নের কাছে। ফুটফুটে দুই মেধাবী ছেলের মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলেও মামলা করার আগ্রহ নেই মিতা নূরের পরিবারের। দুই পরিবারের অলিখিত আপসের মুখে চাপা পড়ে যাচ্ছে মিতার অকাল মৃত্যুর গোপন রহস্য। তদন্তকারী পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার আলামত পাওয়া গেলেও মিতার পিতা ফজলুর রহমান কোন অভিযোগ করেননি। এমনকি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আঘাতের চিহ্ন থাকার তথ্য জেনেও নতুন কোন অভিযোগ দায়ের করেননি। এ অবস্থায় পুলিশের পক্ষে কাউকে দায়ী করে তদন্ত করার আইনগত এখতিয়ার নেই। ফলে আর দশটি অপমৃত্যু মামলার মতোই এ মামলার তদন্তে অপমৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে। সূত্র জানায়, লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশের উপস্থিতিতে দুই পরিবার সমঝোতায় আসে।

গতকালও মিতা নূরের পিতাকে শাহনূরের বাসায় ডেকে নেয়া হয়- যাতে নতুন করে কোন অভিযোগ দায়ের না করেন। ঘনিষ্ঠ এক স্বজন বলেন, ১৭ বছর ও ১২ বছর বয়সী দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পারস্পরিক অভিযোগ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে মিতা নূরের স্বামী শাহনূরের স্বজনরা মিতার পরিবারকে বাধ্য করেন আপসে। তাদের বুঝিয়ে বলেন, মিতা নূর শোবিজ তারকা। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে থানায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তার অসম্মান ঘটবে। পাশাপাশি পারিবারিক মান-সম্মানের হানি ঘটবে। মিতা নূরকে জড়িয়ে গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রতিবেদন ছাপা হবে। এছাড়া, পিতাকে দোষী করে অভিযোগ দায়ের করলে মাতৃহীন দুই ছেলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। শাহনূরের পরিবারের ঘনিষ্ঠ লোকজন এসব যুক্তি তুলে ধরলে মিতা নূরের পিতা-মাতা ও ঘনিষ্ঠ স্বজনরা মুখে কুলুপ আঁটেন। নিপীড়নকারী স্বামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই বলেও সাংবাদিকদের জানান। আপস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফজলুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে পারবো না। আমার মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না। যেখানে মেয়েই চলে গেছে সেখানে নতুন করে মামলা করে আর কি হবে? গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, মিতা নূরের পিতাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছি, তার কোন অভিযোগ আছে কিনা, তার মেয়েকে নির্যাতন করা হয়েছে কিনা- প্রতিবারই তিনি বলেছেন, তিনি কিছু জানেন না। তার কোন অভিযোগ নেই।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, মিতা নূরের মৃত্যুর পরপরই তারা ছায়া তদন্ত শুরু করেন। মিতা ও শাহনূরের ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক বিশ্লেষণ করছিলেন। কিন্তু কোন অভিযোগ না থাকায় তদন্তে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অবশ্য মিতা নূরের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই ফজলুর রহমান সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, তার মেয়েকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে তার স্বামী। এমন নির্যাতন সইতে না পেরেই তার মেয়ের অকাল মৃত্যু হয়েছে। মিতা নূরের সহকর্মীরা জানান, মিতা নূরের ছিল দুই রূপ। ঘরে এক, বাইরে আরেক। কর্মস্থলে তাকে দেখে কেউ অসুখী ভাবতে পারেননি। তার প্রাণবন্ত ও উচ্ছল বিচরণে চাপা পড়েছিল মর্মবেদনা। মুখ বুজে সহ্য করেছেন স্বামীর নিপীড়ন। কখনওই বাইরে প্রকাশ করেননি। ডিভোর্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও একান্ত কাছের লোক ছাড়া কারও সঙ্গে পরামর্শ করেননি। অন্যদিকে ঘরে ঢুকলেই তার হাসি মিলিয়ে যেতো। মনে চেপে বসতো জিদ। অল্পতেই খিটমিট করতেন। রাগ করে না খেয়ে শুয়ে থাকতেন। স্বামীর নানা বদঅভ্যাস ও অপবাদে বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলেন। গত মঙ্গলবার মিতা নূরের লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রতিবেদনে মিতা নূরের বাম পা, ডান হাত ও ডান হাতের বগলে নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. শফিউজ্জামান বলেন, ওই আঘাতে মিতা নূরের মৃত্যু না হলেও আত্মহত্যার প্ররোচনার জন্য যথেষ্ট। ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যার লক্ষণ পাওয়া যায় তার গলায়। ফরেনসিক সায়েন্সের ভাষায় ‘অবলিগ নন কনটিউয়াস হাইআপ উইথ এ গ্যাপ অফ ব্যাক সাইড অফ নেক’ বলা হয়। মৃত্যুর আগে মিতার শরীরে বিষক্রিয়া হয়েছিল কিনা তদন্তের জন্য ভিসেরা পরীক্ষা করা হচ্ছে রাসায়নিক পরীক্ষাগারে। এছাড়া, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি’র কার্যালয়ে মিতা নূরের ওড়না, মুখের লালা ও গোপন অঙ্গের কোষ পরীক্ষা করা হচ্ছে। গত সোমবার ভোরে রাজধানীর গুলশানে নিজের বাসার ড্রইং রুমে মিতা নূরের (৪২) ঝুলন্ত লাশ পায় পুলিশ।

তবে এতো কিছু পর সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন, মিতানূরের মতো এরকম হাজারো নারীর পারিবারিক নির্যাতনের গোপন কান্না নিছক আত্মহত্যার নামে চাপা পরে থাকবে আর কতোকাল?

আগের খবর:
মিতার শরীরে আঘাতের চিহ্ন: আত্মহত্যার প্ররোচনা


হত্যা নয়, স্বামীর পরকীয়ার বলী মিতা!
মিতা নূরের মৃত্যু, স্বামীই হত্যাকারী: দাবি বাবার